পিআরআইয়ের সেমিনারে বক্তারা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কার্যকরে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে

বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিগত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যাদের দৃশ্যমান ব্যবসা নেই, তাদের ঋণ দেয়া হয়েছে। এসব স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শুধু স্বাধীনতা দিলেই হবে না, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। এটা না হলে সেই স্বাধীনতা কার্যকর হবে না। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে গতকাল পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অপরিহার্যতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। পিআরআইয়ের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমেদের সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সুদহার ও ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ডলারের ওপর চাপ কমাতে দাম ধরে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। এতে খেলাপি ঋণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এসব স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে শুধু স্বাধীনতা দিলেই হবে না, বরং তা কার্যকর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি সব সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ছাড়া শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়।’

বিএনপি যখন সরকারে ছিল তখন রাজনৈতিক বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কোনো নিয়োগ দেয়া হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরা অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার করেছিলাম। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিতে আইনি কাঠামো ও নিয়োগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।’

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থনীতির সবকিছু অটোমেশন করে ফেলতে হবে, তাহলে দুর্নীতি কমে আসবে। ক্যাশলেস লেনদেনই হলো এখন ভবিষ্যৎ।’ এ সময় টাকা ছাপানোর প্রথা থেকে বের হয়ে আসার পরামর্শ দেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ‘২০১০ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ডিভিশন (এফআইডি) প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত এক দশকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বল নেতৃত্বও এ প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করেছে।’

তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ হলো দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, প্রবৃদ্ধিকে সহায়তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশ্বাসযোগ্য বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিলে মূল্যস্ফীতি কমে আসে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক কখনো প্রকৃত স্বাধীনতা পায়নি অভিযোগ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমলাদের গভর্নর করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে কয়েকটি পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সুদহার ও ডলারের দাম ঠিক হয়েছে। ওই সময় দেশ থেকে ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার পাচার করা হয়েছে। এসব বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনতা দিতে হবে, বিশেষত মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে।’

ব্যাংক খাতের সব সূচক নেতিবাচক হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই জানতাম, ব্যাংক খাতের সব সূচক খারাপ হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর বিষয়টি আনুষ্ঠানিক হয়েছে, প্রকৃত চেহারা বের হচ্ছে। এতদিন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবহার করা হয়েছে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা দিতে হবে।’

ফাহমিদা খাতুনের মতে, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যাংকিং বিভাগ বিলুপ্ত করে দিতে হবে। ব্যাংক খাতে দ্বৈত শাসন চলবে না। পাশাপাশি এ বিষয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।

সেমিনারে এ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকে আমরা ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে আসছিলাম। সেটা না করে ২০২২ সালে ৪১ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যার চাপ সবাইকে নিতে হয়েছে।’

বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ বলেন, ‘স্বাধীনতা দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। আগে গ্রাহক খেলাপি হতো, এখন ব্যাংক খেলাপি হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংকের লাইসেন্স বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছিল, দেখভালের দায়িত্বও তাদের ছিল।’

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা কার্যকর হবে না। আগে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ নিয়ে কথা হতো। গত কয়েক বছরে যা অলিগার্কে রূপ নিল। তারা ব্যাংক খাতকে কুক্ষিগত করে ক্ষতিতে ফেলল।’

সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ আখতার হোসেন ও বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান ঝুঁকি কর্মকর্তা এনামুল হক।

আরও